দূষিত তুলা। ওজন বাড়াতে ভেতরে ভেতরে দিয়ে দেয়া হয় প্লাস্টিক ও লোহা। ফলে উৎপাদিত সুতা হয় নিম্নমানের। ভারত থেকে আমদানি করা তুলা নিয়ে প্রায়ই এমন কথা শোনা যায় ব্যবসায়ীদের মুখে। এর পরও বাংলাদেশের আমদানি করা তুলার উৎস হিসেবে প্রতিবেশী দেশটির আধিপত্য বাড়ছে। ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলমান ভারতীয় অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর—এ নয় মাসে বাংলাদেশে তাদের তুলার রফতানি বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে প্রতি বছর তুলার চাহিদা কমবেশি ৮৫ লাখ বেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্যটি আনা হলেও দীর্ঘদিন ভারতনির্ভর ছিল বাংলাদেশ। কালক্রমে সে উৎসে পরিবর্তন আসে। ভারতের স্থান দখল করে নেয় আফ্রিকার দেশগুলো। আমদানীকৃত তুলার ৫০ শতাংশের বেশি আসতে শুরু করে পশ্চিম আফ্রিকা, ক্যামেরুন ও শাদ থেকে। কিন্তু গত দুই অর্থবছরে এ চিত্রে আবারো পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি করা তুলার ১৩ শতাংশের উৎস ছিল ভারত। গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) মোট তুলা আমদানিতে প্রতিবেশী দেশটির অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে। চলমান ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানিতে ভারতের আধিপত্য বাড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, ২০২৩-২৪ ভারতীয় অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ভারতের তুলা আমদানির অর্থমূল্য ছিল ১৬৫ কোটি ৮১ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের ২০২৪-২৫ একই সময়ে আমদানি করা তুলার অর্থমূল্য ২০৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার। এ হিসাবে নয় মাসে ভারত থেকে তুলা আমদানি বেড়েছে ২২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
তুলা আমদানির উৎস হিসেবে ভারতের আধিপত্য বাড়ার দুটি কারণ বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সবসময়ই ভারতীয় তুলা হয় নিম্নমানের। ওদের তুলার ভেতরে কন্টামিনেশন (দূষণ) থাকে। প্লাস্টিক, লোহা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দ্রব্য ব্যবহার করে তুলার ওজন বাড়ায় তারা। এসব কারণে মান ও দামে ভালো হওয়ায় আফ্রিকা থেকে আমদানি করা তুলার ব্যবহার আমরা বাড়িয়েছিলাম। তবে এক বছর আফ্রিকা থেকেও বেশ খারাপ তুলা এসেছিল, যা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। সে অভিজ্ঞতার কারণে ভীত হয়ে আফ্রিকার তুলা কমিয়ে ভারত থেকেই আমদানি বাড়ানো হচ্ছে। আর বাস্তবতা হলো ভারতের তুলা খুব দ্রুত পাওয়া যায়। অন্যদিকে আফ্রিকা থেকে তুলা আমদানি হতে এক-দুই মাস সময় লেগে যায়।’
ভারতের তুলার মানোন্নয়ন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, ‘এখনো একই, খারাপ। আমরা জানি এবং মেনে নিচ্ছি, কারণ কিছু করার নেই। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমরা তুলা আমদানি করতে চাই, কিন্তু দাম এখন বেশি। দেশটির তুলা বেশি কিনছে চীন। আমরাও যুক্তরাষ্ট্রের তুলা কিনছি, কিন্তু পরিমাণে বেশি না। তাছাড়া ওই তুলা বাংলাদেশে আসতে দেড় মাস সময় লাগে।’
টেক্সটাইল মিলস মালিকরা বাংলাদেশের নিজস্ব তুলা ব্যবহার করতে চাইছেন বলে জানান খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণ উৎপাদন আছে, সরকার যদি চায় তাহলে তুলা বোর্ডে আমাদের সমন্বয় করে স্থানীয় তুলা ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। আমাদের তুলার চাহিদা পুরোটা স্থানীয় উৎস থেকে পূরণ করা যাবে না। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় স্থানীয় তুলার উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বৈশ্বিকভাবে তুলার বদলে ম্যান মেড ফাইবারের ব্যবহার বেড়েছে। এতে বিশ্বের তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোয় উৎপাদন কমে গেছে। অন্যদিকে ম্যান মেড ফাইবার উৎপাদন শুরু হয়েছে। ফলে আগামীতে তুলার কস্টিংও হবে না। তাছাড়া তুলা উৎপাদনে পানির ব্যবহার বেশি হওয়ায় পরিবেশগত দিকগুলোর বিষয়েও সচেতনতা বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে ভবিষ্যতে তুলার বৈশ্বিক উৎপাদন বিবেচনায় স্থানীয় উৎপাদনে মনোনিবেশ করা খুব প্রয়োজন।’
তুলার স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার বিষয়ে ভাবতে শুরু করেছে সরকারও। ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে গত সোমবার ‘বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে বাংলাদেশে তুলা চাষের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনায় এ বিষয়টি উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানান, তুলাকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করা এবং দেশে উৎপাদন বাড়াতে দুই মাসের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সরকার।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘তুলা রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্র শুল্কারোপ করছে। তবে বাংলাদেশ এর বাইরে। তাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির উদ্যোগ নেয়া হতে পারে।’
যেকোনো মাপকাঠিতেই ভারতের তুলার চেয়ে আফ্রিকার তুলা ভালো। কিন্তু আমদানি সময়কে বিবেচনায় নিয়ে ভারতীয় তুলা ব্যবহারে আপস করতে হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) সভাপতি শেখ মো. সামিউল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিংয়ের যে পরিস্থিতি, রফতানির জন্য যে ঋণপত্র, সেটা অনেক কমে গেছে। এ কারণে পুরো সরবরাহ চক্রটির সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে। অর্থাৎ লিড টাইম কমানোর প্রচেষ্টা রয়েছে। আফ্রিকার তুলা আসতে যেখানে এক মাসের বেশি সময় প্রয়োজন হয়, সেখানে ভারতের তুলা যেগুলো বেনাপোল দিয়ে আসছে সেগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে।’
ভারতের তুলা ব্যবহারের বিরূপ প্রভাব হিসেবে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় পর্যায়ে সুতার মান এক ধাপ নিচে নেমে গেছে। তার পরও স্পিনিং মিলগুলো ভারতের তুলা কিনতে বাধ্য হচ্ছে লিড টাইম বজায় রাখার জন্য। ভারতের তুলার মান খারাপ হলেও দাম তুলনামূলক বেশি। তার পরও সামগ্রিকভাবে সময় এবং আমাদের নিজস্ব জটিলতায় বাধ্য হয়ে তা আমদানি করতে হচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে ভারত থেকে তুলা আমদানি আরো বাড়তে পারে বলেও মনে করছি।’
এর সমাধান হিসেবে শেখ মো. সামিউল ইসলাম বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব ওয়্যারহাউজিং ব্যবস্থা স্থাপন করা। নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিলে এটা সম্ভব। বিশ্বে ওয়্যারহাউজিংয়ের সফল দৃষ্টান্ত আছে। চীনে ৩০-৪০ বছর আগে থেকে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।’